| |

যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের পূর্ণাঙ্গ তালিকা

যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিতের কবলে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশ

ওয়াশিংটন ডিসি, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬: অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এক নজিরবিহীন বাধার সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে, আগামী ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ইমিগ্র্যান্ট (অভিবাসী) ভিসা প্রসেসিং অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের (State Department) এক অভ্যন্তরীণ মেমোর বরাতে জানা গেছে, মূলত ‘পাবলিক চার্জ’ (সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা) এবং কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের (vetting) অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কেন এই হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা?

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এই নির্দেশনার মূলে রয়েছে ১৯৫২ সালের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট-এর কঠোর প্রয়োগ। মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি হলো:

১. জনগণের ওপর বোঝা (Public Charge): তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বদলে সরকারি অনুদান বা ‘ওয়েলফেয়ার’-এর ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা বেশি।

২. নিরাপত্তা ঝুঁকি: আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় (screening procedures) অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, “যতদিন না পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত হতে পারছি যে আগত অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না এবং আমাদের নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করবে, ততদিন এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।”

কাদের ওপর প্রভাব পড়বে?

এই নিষেধাজ্ঞা মূলত ‘ইমিগ্র্যান্ট ভিসা’ আবেদনকারীদের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ যারা গ্রিন কার্ড বা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আবেদন করেছেন (যেমন: ফ্যামিলি স্পন্সরশিপ, ডিভি লটারি বিজয়ীরা)। তবে শিক্ষার্থী, পর্যটক বা ব্যবসায়ীদের জন্য ‘নন-ইমিগ্র্যান্ট’ ভিসা আপাতত এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা ৭৫টি দেশের পূর্ণাঙ্গ তালিকা

নিচে অঞ্চলভিত্তিক প্রভাবিত দেশগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:

১. দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া (South & Central Asia)

এই অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলো বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি ইমিগ্রেশনের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

  • বাংলাদেশ
  • পাকিস্তান
  • আফগানিস্তান
  • ভুটান
  • নেপাল
  • উজবেকিস্তান
  • কাজাখস্তান
  • কিরগিজস্তান
  • তাজিকিস্তান (তালিকায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল)

২. মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (Middle East & North Africa)

নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই অঞ্চলের বহু দেশ তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

  • ইরান
  • ইরাক
  • সিরিয়া
  • ইয়েমেন
  • লেবানন
  • জর্ডান
  • কুয়েত
  • মিশর
  • লিবিয়া
  • মরক্কো
  • তিউনিসিয়া
  • আলজেরিয়া

৩. আফ্রিকা (Sub-Saharan Africa)

আফ্রিকা মহাদেশের বড় অংশ এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে।

  • নাইজেরিয়া
  • সোমালিয়া
  • সুদান
  • দক্ষিণ সুদান
  • ইথিওপিয়া
  • ইরিত্রিয়া
  • ঘানা
  • গাম্বিয়া
  • সেনেগাল
  • সিয়েরা লিওন
  • লাইবেরিয়া
  • ক্যামেরুন
  • কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (Republic of the Congo)
  • গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (DRC)
  • আইভরি কোস্ট (Cote d’Ivoire)
  • টোগো
  • তানজানিয়া
  • উগান্ডা
  • রুয়ান্ডা
  • গিনি
  • কেপ ভার্দে (Cape Verde)

৪. ইউরোপ ও ইউরেশিয়া (Europe & Eurasia)

রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশ এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।

  • রাশিয়া
  • বেলারুশ
  • আর্মেনিয়া
  • আজারবাইজান
  • জর্জিয়া
  • মলদোভা
  • কসোভো
  • বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
  • মন্টিনিগ্রো
  • উত্তর মেসিডোনিয়া
  • আলবেনিয়া

৫. আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল (Americas & Caribbean)

লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশ, যাদের নাগরিকরা নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তারা বাধার মুখে পড়বেন।

  • ব্রাজিল
  • কলম্বিয়া
  • উরুগুয়ে
  • হাইতি
  • কিউবা
  • জামাইকা
  • গুয়াতেমালা
  • বেलीज (Belize)
  • নিকারাগুয়া
  • বার্বাডোজ
  • বাহামা
  • গ্রেনাডা
  • ডোমিনিকা
  • অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা
  • সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস
  • সেন্ট লুসিয়া
  • সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইন

৬. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল

  • মিয়ানমার (বার্মা)
  • থাইল্যান্ড
  • কম্বোজ (Cambodia)
  • লাওস
  • ফিজি
  • মঙ্গোলিয়া

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ

ইমিগ্রেশন আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ (কাল্পনিক নাম) বলেন, “এটি একটি বড় ধাক্কা। বিশেষ করে যাদের ইন্টারভিউয়ের তারিখ চলে এসেছিল বা যারা বহু বছর ধরে এফ-৪ বা এফ-৩ ক্যাটাগরিতে অপেক্ষা করছিলেন, তাদের স্বপ্ন অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে গেল।”

তবে তিনি পরামর্শ দেন, “হতাশ না হয়ে আপনাদের কেস ফাইলগুলো আপডেট রাখা উচিত। অনেক সময় আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে এই ধরনের নির্বাহী আদেশ আদালতে স্থগিত হয়ে যায়। তাই নিজের স্পন্সর এবং আইনজীবীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি।”

পরবর্তী পদক্ষেপ:

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস বা কনস্যুলেট থেকে আনুষ্ঠানিক ইমেইল বা নোটিশ না পাওয়া পর্যন্ত আবেদনকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২১ জানুয়ারির পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


Similar Posts